টয়লেটে পাওয়া শিশুটির মা কতোটা দোষী?

হাসপাতালের টয়লেটে পাওয়া চাঁদের চেয়েও সুন্দর বাচ্চাটির নাম রাখা হয়েছে ‘গহীন’। সে এখন রাজধানীর আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসে আছে। একদিন সে বিশ্বখ্যাত মানুষ হবে এই প্রত্যাশা করি। পাশাপাশি শত সমালোচনা সত্ত্বেও শিশুটির মায়ের মানবিকতা, মাতৃত্বের দায় ও বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করি।

কারণ, তিনি রক্তে মাংসে গড়া এই নিষ্পাপ ও অবৈধ সন্তানটিকে লোকলজ্জার ভয়ে হত্যা করে ফেলতে পারতেন, ডোবায় বা নর্দমায় ফেলে দিতে পারতেন। তিনি তা করেননি। তিনি পাষাণী মা হলেও তাকে প্রাণে বাঁচিয়ে রেখে মাতৃত্বের দায় রক্ষা করেছেন। তিনি চিন্তা করেছেন ফুলের পাপড়ীর মতো ফুটফুটে এই সন্তানটিকে কোনোভাবেই হত্যা করা যাবে না। তিনি চেয়েছেন, বাচ্চাটি কোনো নিঃসন্তান দম্পতির ঘরে মাতৃস্নেহে বেড়ে উঠুক। তিনি ভেবেছেন এই অবৈধ সন্তানটির খবর তার সমাজ, আত্মীয়-স্বজন ও পরিজনের কাছে চাউর হওয়ার আগে কিভাবে এর একটা বন্দোবস্ত করা যায়!

ভাবলেন গোপনে হাসপাতালের বাথরুম বা টয়লেটে রেখে আসতে পারলে বাচ্চাটির রক্ষা হবে। এতে বাচ্চাটি খুব দ্রুত মানুষের নজরে আসবে এবং একটা সুব্যবস্থা হবে। এতে শিশুটি বড় ধরনের ক্ষতি বা ঝুঁকি থেকে বেঁচে যাবে। অবশেষে প্রসবের দু-চার দিনের মাথায়ই তিনি তার এই পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করলেন। তিনি যেভাবে চেয়েছিলেন তার চেয়ে আরও সুন্দরভাবে শিশুটির সুরক্ষা হলো। একেবারে সরকারি তত্ত্বাবধানে লালন-পালন ।

একজন মা হিসেবে এখন তিনি নিশ্চয়ই সামাজিক লোক-লজ্জামুক্ত, নিরাপদ এবং স্বস্তিতে আছেন। বলা যায় বড় ধরনের বিপদ বা অস্বস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছেন। রক্ষা করেছেন তার সন্তানটিকেও। তিনি হয়তো এখন টিভি বা খবরের কাগজে চোখ রেখে তার সন্তানের আপডেট খবর রাখছেন। অনেকে শিশুটির এই পাষাণী মাকে খারাপ ভাষায় গালি দিচ্ছেন, আমি এর সাথে দ্বিমত পোষণ করি। কারণ আপনি তো ঘটনাটি জানেন না। হতে পারে শিশুটি ধর্ষণের ফল, অথবা সেটি নাও হতে পারে। কিন্তু না জেনে কেন গালাগালি করবেন?? বাচ্চাটির মা হয়তো ভেবেছেন, এই বাচ্চাটিকে নিয়ে সমাজে মুভ করতে পারবেন না, পদে পদে অপমানিত-অপদস্থ হতে হবে৷ বিধায় নিজের এবং সন্তানের কল্যাণের জন্যই এই নির্মম কাজটি করতে তিনি বাধ্য হয়েছেন। প্রায়ই যে খবর হয়, অমুক ডোবায় বা রাস্তায় প্যাকেট করা নবজাতকের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। তিনি তো আর এমনটি করেননি। নিজে পাপ করলেও সন্তান হত্যা করেননি। এদিক থেকে আমি তার মানবিকতা ও মাতৃত্বের দায় রক্ষার প্রশংসা করি।

ইতোমধ্যে বাচ্চাটিকে কে টয়লেটে রেখে গেলেন- সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত তার একটি ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। পুলিশ চেষ্টা করলে এই বাচ্চার রহস্য উদঘাটন অসম্ভব নয় বলে মনে করি।

উল্লেখ, মঙ্গলবার (১৪ মে) দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের শিশু হাসপাতালের টয়লেট থেকে দু-চার দিন বয়সী এই নবজাতককে উদ্ধার করা হয়।

সঙ্গে সঙ্গে ওই হাসপাতালের এক নিঃসন্তান ওয়ার্ডমাস্টার রাসেল ও তার স্ত্রী শিশুটিকে বুকে আগলে নিয়ে নিজেদের টাকা খরচ করে হাসপাতালে ভর্তি করেন, ক্যাবিন ভাড়া করেন এবং মাতৃস্নেহ দিয়ে ৩ দিনেই তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলেন। তারা ধরে নিয়েছিলেন বাচ্চাটি তারা সারা জীবনের জন্যই পাবেন। কিন্তু সেটি আর হয়ে ওঠেনি। এই দম্পতি শিশুটিকে দত্তক পেতে কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন, কান্নাকাটিও করেছেন৷ কিন্তু বাচ্চাটি কারো কাছে হস্তান্তর না করে সমাজকলাণ অধিদফতরের অধীনে ছোটমণি নিবাসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ইসরাত জাহান জানিয়েছেন, শিশুটি এখন আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসে আছে। সেখানে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে পারিবারিক আদালত বসিয়ে কাকে দত্তক দেয়া হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। গত তিনদিনে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের ছোট ছেলেসহ বিভিন্ন মহলের শতাধিক ব্যক্তি শিশুটিকে দত্তক নিতে আবেদন করেছেন। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তির কাছে শিশুটিকে তুলে দেয়া হবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

(ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *