তামাক ধ্বংস করে মানবদেহে ঝুঁকি বাড়ায় করোনা

তামাকের কারণে প্রতিবছর বিশ্বে ৮০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশেই বছরে এক লাখ ২৬ হাজার মানুষ মারা যায় তামাক ব্যবহারজনিত রোগে। এছাড়া ৩ থেকে ৪ লাখ লোক তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণে অসুখ ও অক্ষমতাজনিত কুফল ভোগ করে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন ধূমপান, তামাক ও ভ্যাপিং পণ্য ব্যবহারে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায় অনেকটাই।

ধূমপানের মূল উপাদান তামাক। এই তামাকের কারণে শ্বাসতন্ত্রের নানা সংক্রমণ এবং শ্বাসজনিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি জানিয়েছে, অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের কোভিড-১৯ সংক্রমণে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এ ছাড়া গবেষণা দেখা গেছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ধূমপায়ীর মৃত্যুঝুঁকিও ১৪ গুণ বেশি।

ইউএস সার্জন জেনারেল রিপোর্টে বলা হয়, অল্প বয়সে তামাকপণ্যে আসক্ত হয় পড়লে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে এবং বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ফুসফুসের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। ফুসফুস ক্যান্সার, হৃদরোগ, অকাল বার্ধক্য, মানসিক অস্থিতিশীলতাসহ নানাবিধ রোগ সৃষ্টি হয় তামাকের কারণে।

তামাকের বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি রয়েছে। যেমন ক্যান্সার, হার্টের বিভিন্ন রোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট ও পায়ে পচন এবং ধুয়াবিহীন তামাক জর্দা ও সাদাপাতা ব্যবহারের ফলে খাদ্যনালীতে ক্যান্সারসহ নানা শারীরিক জটিলতা সম্পর্কে এখন আর কারো অজানা নয়।

বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার সম্পর্কে বলতে গেলে এখানে ধূমপায়ীর হার শতকরা ৪৩ ভাগ। ধুয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারী মহিলার হার ২৮% এবং পুরুষ ২৬% ভাগ। সিগারেটের ব্যবহারকারী পুরুষ ৪৫% এবং মহিলা ১.৫%। বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকের কারণে প্রায় এক লাখ লোক মৃত্যুবরণ করে। এছাড়া ৩ থেকে ৪ লাখ
লোক তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণে অসুখ ও অক্ষমতাজনিত কুফল ভোগ করে।

তামাক সেবনের কারণে হৃদরোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, দীর্ঘ দিনের শ্বাসযন্ত্রের রোগের মত অসংক্রামক রোগে সারা বিশ্ব জুড়ে বহু মানুষ মারা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে বলা যায়, প্রতি বছর ৩৮ লাখ মানুষ অসংক্রামক রোগে মারা যান ও এদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্য আর্থিক সামর্থের দেশগুলোতে।

তামাকজাত পণ্যের মধ্যে ৫ হাজার টক্সিন জাতীয় উপাদান রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে- নিকোটিন, কার্বন মনোক্সাইড, টার অর্থাৎ আলকাতরা বা পিচ। নিকোটিন এক প্রকার বিষ, যা সেবন করলে মানুষ ক্রমশ: আসক্ত হয়ে পড়ে। তামাক সেবনের পর নিকোটিন দ্রুত মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের বিপাককে প্রভাবিত করে।

নিকোটিন মস্তিষ্কের সঙ্গে মিশে মস্তিষ্কের বিপাককে প্রভাবিত করে। তারপর নিকোটিন সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে ও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে কঙ্কাল পেশীকে। কার্বন মনোক্সাইড শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয় ও শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করে।

আলকাতরা হল চটচটে অবশিষ্টাংশ যার মধ্যে থাকে ক্ষতিকারক বেঞ্জপিরিন। অন্যান্য যৌগের মধ্যে পড়ে কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, অ্যামোনিয়া, উদ্বায়ী নাইট্রোসায়ামিন, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, উদ্বায়ী সালফার ধারণকারী যৌগিক, উদ্বায়ী হাইড্রোকার্বন, এলকোহল, এলডেহাইডস এবং কিটোনস। এদের মধ্যে\ কিছু উপাদান শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ক্যান্সারের কারণ।

তামাক ব্যবহারের ফলে আর্থিক ক্ষতি, স্বাস্থ্যের ক্ষতি ও পরিবেশের ক্ষতি অনেক। তামাকের প্রভাবে অসংক্রামক রোগ মৃত্যুর অন্যতম কারণ। কার্ডিওভাসকুলার রোগ এবং ক্যান্সারের চিকিৎসায় কোনো ব্যক্তি ও পরিবারের উপর সর্বোচ্চ আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেয় তামাক ব্যবহার। তামাক চাষের কারণে অনেক বন ও জঙ্গল এবং আবাদী চাষের জমি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তামাক পোড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিকারক টক্সিনজাতীয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশের ক্ষতি করে।

তামাক সেবনের ফলে শ্বাসনালী, ফুসফুস, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল এলাকা, যকৃত, বৃক্ক বা কিডনি, মূত্রথলি, মুখগহ্বর, নাসারন্ধ্র, গলদেশ এই ধরনের অনেক অঙ্গেই ক্যান্সারের সম্ভাবনা রয়েছে।

স্ট্রোক মস্তিষ্কের এক সংবহনতান্ত্রিক রোগ। তামাক সেবনের ফলে এই সংবহনতন্ত্র বদ্ধ হয়ে যায় এবং এর ফলে স্নায়ু সচেতনতা কমে যায় ও প্যারালাইসিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তামাক সেবন করনারী ধমনীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এর ফলে ইস্চেমিক বা করোনারি হৃদরোগ হতে পারে।

তামাক ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ যেমন ক্রনিক ব্রংকাইটিস এবং এমফিসেমার জন্য ক্ষতিকারক। ধূমপান হাঁপানির তীব্রতা অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া টিবি বা যক্ষ্মার রোগের অন্যতম কারণ এই তামাক।

গর্ভাবস্থায় তামাক সেবন করলে বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নিতে পারে। শিশুর মধ্যে এলার্জির ঝুঁকি থাকে, উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে পারে, স্থূলতার সম্ভাবনা থাকে এবং শিশুর হাঁপানির সম্ভাবনা খুবই বেশি থাকে।

তামাক সেবনের আরও উল্লেখযোগ্য খারাপ দিকগুলো হল – বাত রোগ, কিডনির ক্ষতি, চোখের রোগ, পেশী-ভঙ্গুরতা, দাঁতের ক্ষয় রোগ, ডায়াবেটিস (মধুমেহ) এবং প্রদাহজনিত পেটের রোগে ভোগার সম্ভাবনা খুবই বেশি।

তামাকের উপরোক্ত ক্ষতিকর দিকগুলো জানার পর তাই আসুন তামাক বর্জনের শপথ নেই। সুস্থ জীবন লাভ করি, পরিবেশ বাঁচাই, নতুন পৃথিবী গড়ে তুলি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *