টাঙ্গাইলে মাদকের ভয়াবহ বিস্তারে বাড়ছে সব অপরাধ

মাদককে বলা যায় নানামুখী অপরাধ কর্মকাণ্ডের সূতিকাগার। অন্য সব কারণের পাশাপাশি মাদক সেবন আর কারবারকে ঘিরেই ঘটে থাকে চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, এমনকি হত্যাকাণ্ডও। আর টাঙ্গাইল জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই চলে আসে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার। ফলে জেলায় আইন-শৃঙ্খলার সার্বিক চিত্র সন্তোষজনক নয়। আবার বিনা কারণে মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া এবং উৎকাচের বিনিময়ে দোষীদের ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে খোদ পুলিশের বিরুদ্ধেও।

জেলাজুড়ে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজার মতো মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। মাদকাসক্ত হয়ে যুবসমাজ জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে। জেলায় প্রতি মাসে গড়ে শতাধিক মামলা হচ্ছে। আর যতগুলো অপরাধের মামলা হয় তার প্রায় ৮০ শতাংশই মাদকসংক্রান্ত। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত কতিপয় পুলিশ সদস্যের কারণে সেসব অভিযান পুরোপুরি সফল হচ্ছে না।

জেলায় গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ৪৯টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে ৪০টি ঘটনায় পুলিশ ৯৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। বাকি ৯টি হত্যাকাণ্ডের মামলা তদন্ত করছে পিআইবি ও সিআইডি। বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন শেষে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানায়। ওই ১০ মাসে জেলার ১২টি থানায় নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয় ১৩০টি, যার মধ্যে ৯১টিই ধর্ষণসংক্রান্ত। পুলিশ সুপার কার্যালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

মাদকের আড্ডা : জানা যায়, টাঙ্গাইল শহরের বেড়াবুচনা প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ, কাজীপুর মহিলা মাদরাসার পাশে, শান্তিকুঞ্জ মোড়, বাজিতপুর হাট, শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যান, মুক্ত মঞ্চ, টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের পাশে, স্টেডিয়াম এলাকা, দেওলা উত্তরপাড়া, শিবপুর থেকে কান্দিলা যাওয়ার পথে মেহগনিবাগানে প্রায় প্রতিদিনই নেশার আসর বসে।

এ ছাড়া বাসাইল উপজেলা সদরে হাসপাতালের অসমাপ্ত ভবন ও এর আশপাশ, পরিত্যক্ত ইটভাটা, কাঞ্চনপুর নদীর পার ও পশ্চিমপাড়া মাদরাসার পেছনে, নাগরপুর উপজেলার কোনাবাড়ী চৌরাস্তা, চৌধুরীবাড়ির পরিত্যক্ত ভবন, নরদই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশ, উপেন্দ্র সরোবর এলাকা, দেলদুয়ার উপজেলার এলাসিন পরিত্যক্ত ঘাট, সিলিমপুর সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ডের পাশে, ঘাটাইল ও মধুপুরের পাহাড়ি এলাকায় নিয়মিত মাদকের আড্ডা বসছে।

পুলিশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ : পুলিশের অভিযানে মাঝেমধ্যে মাদকাসক্ত বা মাদক কারবারি আটক হলেও কতিপয় অসাধু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার ক্ষেত্রবিশেষে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। এ রকম অভিযোগে গত বছরের ২৮ নভেম্বর মির্জাপুর থানার বাঁশতৈল পুলিশ ফাঁড়ির একজন সহকারী উপপরিদর্শক ও দুই কনস্টেবলসহ চারজনকে আটক করে স্থানীয় জনতা। সখীপুর উপজেলার হতিয়া রাজাবাড়ী এলাকার গাবিলার বাজার

এলাকায়ও এমন ঘটনা ঘটে। পরে সখীপুর থানার পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করলে দুই দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়। অভিযুক্তদের সাময়িক বরখাস্তও করা হয়।

চাঁদাবাজি ও হত্যার মতো অপরাধে জড়িত থাকারও অভিযোগ রয়েছে পুলিশের কোনো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে। গত বছর জেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তত ১৪ জনের বিরুদ্ধে নানা অপরাধের অভিযোগ ওঠে। কালিহাতীতে এক যুবক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গত বছরের ২০ জুন এক কনস্টেবলসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আবার কনস্টেবল পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে গত বছরের ২০ জুন রাতে ঘুষ লেনদেনের সময় দুই পুলিশ সদস্যকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করায় ওই বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি দুজন এএসআই ও তাঁদের চার সহযোগীকে আটক করা হয়। মির্জাপুরে ডাকাতিচেষ্টার অভিযোগে গত ১৯ জানুয়ারি রাতে ধরা পড়ে সংশ্লিষ্ট থানার উপপরিদর্শক সোহেল কদ্দুছসহ পাঁচজন। আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠে।

টাঙ্গাইল গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি শ্যামল কুমার দত্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদক থেকে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডও ঘটে। মাদক নির্মূল করতে পারলে অনেক অপরাধ কমে যাবে। তাই আমাদের প্রধান টার্গেট হচ্ছে জেলাকে মাদকমুক্ত করা।’

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রাম পর্যায়ে মাদকের বিস্তার ঘটার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। তবে পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, সব ধরনের অপরাধ দমন করাই পুলিশের টার্গেট। তবে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হয়েছে। সবাই এগিয়ে এলে মাদক নির্মূল করা সম্ভব। পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আর মাদকসহ কাউকে আটক করার পর ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে তাঁরা আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে যান। এ ক্ষেত্রে পুলিশের কিছু করার থাকে না।

#কালের কণ্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *