অবশেষে ‘মৃত্যুকূপ’ ছাড়ছেন সিলেটের পাথরশ্রমিকরা

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে নিষেধাজ্ঞার পরও বন্ধ হচ্ছে না অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন। ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে একের পর এক শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটছে। মৃত্যুর মিছিলের সারথি হচ্ছেন অসহায় পরিবারের দিনমজুর পাথরশ্রমিকরা। কোয়ারিগুলো এখন পরিণত হয়েছে এক মৃত্যুকূপে। বেআইনিভাবে পাথর উত্তোলনের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণেই এসব বিয়োগান্তুক ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ সচেতন মহলের।

পাথরের গর্তে চাপা পড়ে অসংখ্য মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও দাপট কমছে না পাথরখেকোদের। মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হলেও সদর্পে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আসামিরা। দিনমজুরদের অসহায়ত্বের সুযোগে পাথরচাপার মতো ফাইলচাপা অবস্থায় পড়ে আছে হত্যা মামলাগুলো। তবুও জীবনের তাগিদে দুমুঠো ভাত খেতে ঝুঁকি নিয়েই কাজ করছে শ্রমিকরা।

তবে বেআইনিভাবে পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হলেও এবার শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তায় পুরোদমে অভিযানে নেমেছে উপজেলা প্রশাসন। বুধবার পুলিশ ও বিজিবির অভিযানে কালাইরাগ এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ পাথরের গর্তে কাজ করা শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রায় ১২০০ শ্রমিকের ৫৫টি তাঁবু ভেঙে থালা-বাসনসহ বাড়িতে পাঠানো হয়। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে অভিযান শুরু হয়। শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তায় দিনভর চলে এই অভিযান।

এর আগে ১৫ দিনের ব্যবধানে পাথরের গর্তে মাটিচাপা পড়ে তিন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় গত সোমবার অভিযান শুরু করে টাস্কফোর্স। অভিযানে ২১টি পাথর কোয়ারি ও প্রায় সাত কোটি ৮০ লাখ টাকার সরঞ্জাম ধ্বস করা হয়। অন্যদিকে থানা পুলিশ গত মঙ্গলবার মাইকিং করে পাথর উত্তোলন বন্ধের ঘোষণা দেয়।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন আচার্য জানান, ভোলাগঞ্জের কালাইরাগ এলাকায় বুধবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে অভিযান শুরু করা হয়। এখানে ৫৫টি ঝুঁকিপূর্ণ অস্থায়ী তাঁবু খাঁটিয়ে অবস্থান করা প্রায় ১২০০ পাথরশ্রমিককে নিজ নিজ বাড়িতে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয় এবং তাবুগুলো উচ্ছেদ করা হয়। অভিযানে সহযোগিতা করছেন পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা।

তিনি আরও জানান, পাথরশ্রমিকের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঠেকাতে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে গত দুইদিন ধরে এই এলাকায় পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১৫ দিনের ব্যবধানে শাহ আরেফিন টিলায় লিটন ও তানভির নামের দুই শ্রমিক এবং ভোলাগঞ্জে আব্দুস সালাম নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গত ৩১ জানুয়ারি শাহ আরেফিন টিলায় পাথরখেকো আঞ্জব আলী ও উপজেলা চেয়ারম্যান শামীম আহমদের যৌথ মালিকানাধীন পাথরের গর্তে তানভির নামের এক শ্রমিক মারা যাওয়ার পর পুলিশের সহযোগিতায় মরদেহ গুম করা হয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রচেষ্টায় মরদেহ সুনামগঞ্জ থেকে উদ্ধার করা হয়।

এর আগে একই কায়দায় দাফনের আগমুহূর্তে ভোলাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা আলী আমজাদ ও আব্দুল হকের গর্তে পাথরচাপায় নিহত শ্রমিক আব্দুস সালামের মরদেহ উদ্ধার করে উপজেলা প্রশাসন।

গত তিন বছরে কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলায় অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে ৩০ জন নিহত এবং শতাধিক পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। অপরদিকে ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিতে অন্তত ২০ জন শ্রমিক নিহত এবং অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন।

২০১৮ সালে ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলী আমজাদের গর্তে পাথরচাপা পড়ে একইদিনে ৬ জন নিহত হন। এ ঘটনায় আলী আমজাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের হলে তিনি দীর্ঘদিন কারাভোগ করে জামিনে মুক্তি পান। এর পরও থামেনি আলী আমজাদ বাহিনীর ধ্বংসলীলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *