যেভাবে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা হলো ব্র্যানসনের

ব্র্যানসনের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার। মাত্র ৪১ বছর বয়সেই বিলিয়নিয়ারের খাতায় নাম ওঠানো ছন্নছাড়া এই ব্যবসায়ী ১৬ বছর বয়সেই স্কুল থেকে ঝরে পড়েছিলেন। ৭০ বছর অতিক্রম করলেও কাজেকর্মে এখনো তারুণ্য ধরে রেখেছেন তিনি, লোকে তাকে প্লেবয় সম্বোধন করে। তিনি তাই করেন, যা করতে তিনি ভালোবাসেন। কিন্তু এমন একজন খেপাটে মানুষ কী করে নিজের চেষ্টায় মাত্র ৪১ বছর বয়সে বিলিয়নিয়ারের খাতায় নাম লেখালেন তা অনেকের কাছেই বিস্ময়। লিখেছেন পরাগ মাঝি

কে এই ব্র্যানসন?

১৬ বছর বয়সে ব্র্যানসনকে যখন স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয় তখন ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাকে বলেছিলেন, ‘হয় তুমি জেলে যাবে, না হয় কোটিপতি হবে।’ ব্র্যানসনের জীবনে দুটিই সত্যি হয়েছিল। ব্যবসা শুরু করার প্রথম দিকেই তার জেলে যাওয়ার ব্যাপারটি সত্যি হয়। তবে, এই অভিজ্ঞতা তাকে ব্যবসায় আরও মনোযোগী করে এবং ব্যবসা তাকে সত্যি সত্যিই বিলিয়নিয়ার বানিয়ে দেয়।

রিচার্ড ব্র্যানসন ভার্জিন এয়ারলাইন্স এবং ভার্জিন রেকর্ডসের প্রধান নির্বাহী। তার আস্তানা তথা বসবাসও ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে। ক্যারিয়ারের একটি দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ‘রোলিং স্টোন’ ও ‘দ্য সেক্স পিস্তলস’-এর মতো সংগীত জগতের সেরা কয়েকটি ব্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেছেন। কয়েক দশক ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে তার ভার্জিন রেকর্ডসের শোরুমগুলো। এছাড়া গৃহস্থালি সংক্রান্ত নানা পণ্যের ব্র্যান্ড হলো ভার্জিন। ভার্জিন গ্রুপের অধীনে ভার্জিন এয়ারলাইন্সসহ অন্তত ৪০০টি কোম্পানি রয়েছে। এই গ্রুপের অধীনে অন্তত ৭১ হাজার কর্মী কাজ করছে। আর গ্রুপের বার্ষিক আয়ের পরিমাণটিও চমকে দেওয়ার মতো, প্রায় ২২.৩ বিলিয়ন ডলার।

বারাক ওবামা মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার মেয়াদ শেষ করার পর সপরিবারে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন ভার্জিন আইল্যান্ডে ব্র্যানসনের আস্তানায়। একজন সাধারণ কিশোর থেকে জীবনের এই পর্যায়ে আসতে তিনি ব্যবসাকেই বেছে নিয়েছিলেন। তার ব্যবসায়িক অভিযান কোনো অংশেই কম রোমাঞ্চকর নয়।

দারুণ সব আইডিয়া

জীবনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ব্র্যানসনের মধ্যে যে ব্যাপারটি প্রকট তা হলো- তার একটি উদ্যোক্তা মন। তিনি ইংল্যান্ডের সারে’তে ১৯৫০ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তবে তার বাবা-মা ধনী ছিলেন না। খুব অল্প বয়সেই তিনি স্কুলের গ্রেড নম্বর বাড়ানোর চেয়ে বরং অর্থ কামাইয়ের প্রতিই বেশি মনোযোগী ছিলেন। আর সেই বয়স থেকেই তিনি ছিলেন দারুণ চালাকও। ডাক্তাররা তার মধ্যে ডিজল্যাক্সিয়া নামে একটি রোগ শনাক্ত করেন। এই রোগে আক্রান্তরা পড়াশোনায় খুবই ধীরগতির হয়। তবে, মাত্র ১৫ বছর বয়সেই স্কুলে পড়া অবস্থায়ই টাকা কামানোর একটি ফন্দি বের করেছিলেন ব্র্যানসন। তিনি ‘স্টুডেন্ট’ নামে একটি মাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন। এই ম্যাগাজিন তিনি বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করা শুরু করেন। ম্যাগাজিনটি শিগগিরই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ, তিনি ভালো করেই জানতেন তার বয়সী শিক্ষার্থীরা মূলত কী চায়। ম্যাগাজিন প্রকাশের ১ বছর পর অর্থাৎ ব্র্যানসনের যখন ১৬ বছর বয়স তখনই তিনি স্কুলের পড়াশোনা ছেড়ে দেন। কারণ সেবার তার ম্যাগাজিনটি এক মাসেই ৮ হাজার ডলারের বিজ্ঞাপন পেয়ে যায়। তাই তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে নিজের ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কারণে ব্র্যানসনের যত্রতত্র আনাগোনা শুরু হয়। তিনি সেই সময়টিতে কতগুলো হিপ্পি ইংলিশ ব্যান্ডের সঙ্গে ঘোরাঘুরি শুরু করেন। ১৯৬০-এর দশকের এই ব্যান্ডগুলোর সদস্যরা মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণ মাদকাসক্তির জন্য কুখ্যাত ছিল। স্বাভাবিকভাবেই ব্র্যানসনও পুরোদস্তুর এক মাদকাসক্তে পরিণত হন। সেই সময়টি ছিল মুক্ত ভালোবাসা আর উডস্টকের আমল। অর্থাৎ সেই সময়টিতে রক মিউজিকের জোয়ার বইছিল পশ্চিমা দেশগুলোতে। হিপ্পি ব্যান্ডগুলোই ছিল এই আমলের জ্বালানি শক্তি। সেই সময়টিতে যেহেতু কোনো ইন্টারনেট ছিল না তাই তরুণ-তরুণীরা ম্যাগাজিন এবং রেডিওর মতো বিনোদন মাধ্যমগুলোকে খুব ভরসা করত। আর এই মাধ্যমগুলোতেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নতুন নতুন রিলিজ হওয়া মিউজিকের খোঁজ পেত তারা। সেই সময় ছোটখাটো উঠতি গায়কদের গান রেকর্ড করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন ব্র্যানসন। আর এজন্য ১৯৭০ সালে তিনি গড়ে তোলেন ভার্জিন গ্রুপ। প্রাথমিক অবস্থায় এটি ছিল তার ম্যাগাজিন প্রকাশনাকে সহায়তা করার জন্য। সেই বছরই তিনি আরেকটি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে চালু হয় মেইল অর্ডার সার্ভিস। এই সার্ভিসের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় সংগীতপ্রেমীদের কাছে বিভিন্ন গায়কের রেকর্ড করা অ্যালবাম সরবরাহ করতেন তিনি। এর আগে স্থানীয় মিউজিক স্টোরে যেসব অ্যালবাম পাওয়া যেত সেসব নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হতো শ্রোতাদের। ব্র্যানসন এক্ষেত্রে নতুনত্ব যোগ করলেন এবং দূর-দূরান্তে পৌঁছে দিতে লাগলেন কাক্সিক্ষত সব অ্যালবাম। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, তার মেইল অর্ডার সার্ভিসটি যুক্তরাজ্যে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠিত তারকা থেকে শুরু করে উঠতি গায়কদের সঙ্গে ব্র্যানসনের সুদৃঢ় যোগাযোগের ওপর ভিত্তি করে ১৯৭২ সালে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডশায়ারে প্রথমবারের মতো গড়ে তোলা হয় ‘ভার্জিন রেকর্ডস’ নামে একটি স্টুডিও। এই স্টুডিওর জন্যই পরে ব্র্যানসনের ঘনিষ্ঠ অসংখ্য গায়ক-গায়িকার নতুন নতুন অ্যালবাম প্রকাশিত হতে থাকে। এই স্টুডিওর একেবারে শুরুর দিকে ধারণ করা হয়েছিল ইংলিশ মিউজিশিয়ান মাইক ওল্ডফিল্ড-এর ‘টাম্বলার বেলস’। এই অ্যালবামেই বাজিমাত করেন ব্র্যানসন। কারণ যন্ত্রসংগীতের এই অ্যালবামটি এতটাই শ্রুতিমধুর ছিল যে, যুক্তরাজ্যের অ্যালবাম টপ চার্টে ২৪৭ সপ্তাহ ধরে এটি শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিল। খুব শিগগিরই মিউজিকের ভুবনে এক শক্তিশালী স্টুডিও হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ভার্জিন রেকর্ডস। শুধু তাই নয়- এই স্টুডিওর সঙ্গে ‘দ্য সেক্স পিস্তলস’, ‘দ্য রোলিং স্টোনস’ এবং ‘জেনেসিস’-এর মতো বিশ্বখ্যাত ব্যান্ডগুলোর চুক্তি করাতে সক্ষম হন ব্র্যানসন। সেই সময়টিতে ‘দ্য সেক্স পিস্তলস’ ছিল একটি বিতর্কিত ও কুখ্যাত রক ব্যান্ড। তাই কোনো স্টুডিওই এই ব্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। তারপরও এই ব্যান্ডের জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। তাই বিতর্কিত এই ব্যান্ডের গান শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যেহেতু শুধু সাহসেরই প্রয়োজন ছিল, সে ক্ষেত্রে ব্র্যানসন ছিলেন নম্বর ওয়ান। ‘দ্য সেক্স পিস্তলস’-এর সঙ্গে চুক্তি করে সময়টাকে নিজের করে নিয়েছিলেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় আজকের দিনেও ‘দ্য সেক্স পিস্তলস’-এর গানগুলো বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ধীরে ধীরে ভার্জিন রেকর্ডস হয়ে ওঠে সংগীতের বিশ্বখ্যাত এক আঁতুড়ঘর। সারা পৃথিবীতেই এই স্টুডিওর একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হয়।

১৯৯২ সালে ভার্জিন রেকর্ডস স্টুডিওটি বিক্রি করে দেন। এই স্টুডিওটি এক বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছিল ইএমআই নামে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। অর্থাৎ ৪১ বছর বয়সেই বিলিয়নিয়ার হয়ে গিয়েছিলেন ব্র্যানসন। কেউ যখন বিলিয়নিয়ারের খাতায় নাম ওঠায়, নিঃসন্দেহে এটা হয় তার জন্য বিরাট এক অর্জন। কিন্তু পকেটে বিলিয়ন ডলার নিয়েও ব্যবসার চিন্তা থেকে একচুলও সরে আসেননি ব্র্যানসন। উপরন্তু তিনি ভাবছিলেন, কীভাবে তার অন্যান্য ব্যবসাকে আরও এগিয়ে নেওয়া যায় এবং নতুন আরও কী কী ব্যবসা শুরু করা যায়। স্টুডিওটি বিক্রি করে দেওয়ার পর প্রকাশ্যেই হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন তিনি। এর মাধ্যমেই প্রমাণ হয়েছিল যে, টাকায় সুখ কিনতে পারেননি ব্র্যানসন। সত্যিকারভাবেই তিনি তার সংগীত ভুবনকে ভালোবাসতেন। কিন্তু স্টুডিওটি যখন তার হাতছাড়া হয়ে গেল, তখন তিনি দারুণ ব্যথিত হলেন। তবে, তিনি মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে থাকারই সিদ্ধান্ত নিলেন। পরের বছরই তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন ভার্জিন রেডিও। এছাড়া ১৯৯৬ সালে তিনি ভি-টু নামে দ্বিতীয় আরেকটি স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন।

যেভাবে আরও ছড়াল ভার্জিন ব্র্যান্ড

সংগীত ভুবন থেকে কিছু সরে এলেও রিচার্ড ব্র্যানসনের আরেকটি শখ ছিল সারা পৃথিবী ঘুরে দেখা। তিনি যেখানেই ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই উড়ে গেছেন। ১৯৮৪ সালে পুয়ের্তো রিকো থেকে ভার্জিন আইল্যান্ডগামী একটি ফ্লাইটের যাত্রী ছিলেন। কিন্তু কোনো কারণে ওই ফ্লাইটটি বিলম্বিত এবং অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। ভার্জিন আইল্যান্ডে তার জন্য বিশেষ এক বন্ধু অপেক্ষা করছিল তখন। তাই কোনো অবস্থাতেই এই যাত্রাটি তিনি মিস করতে চাননি। এমনকি, নিজের টাকা দিয়েই তিনি আরেকটি বিমান ভাড়া করে ফেললেন এবং অপেক্ষমাণ যাত্রীদের এই প্লেনে চড়ার অফার দিলেন। ব্র্যানসন হিসাব করে দেখলেন, যে টাকায় বিমানটি ভাড়া করা হয়েছে তাতে যদি সবাই চড়ে বসে তবে প্রত্যেকের ভাগে মাত্র ৩৯ ডলার করে পড়বে। এই অর্থ খরচ করে ভার্জিন আইল্যান্ডে যেতে সবাই রাজি ছিল। এই ব্যাপারটিতে বেশ মজা পেয়ে যান ব্র্যানসন। তার মাথায় আরেকটি ব্যবসার চিন্তা চলে আসে। এই চিন্তা থেকে ওই বছরই তিনি ভার্জিন এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ব্যবসা চালু করলেই তো আর হবে না, এটাকে পরিচালনাও করতে হবে। আর তাছাড়া এয়ারলাইন ব্যবসা একটি মারাত্মক কঠিন ব্যবসা। বিশেষ করে, যারা এই ব্যবসায় নতুন, তাদের জন্য তো বটেই। কিন্তু কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই শিগগিরই এই ব্যবসাটির শীর্ষে চলে এসেছিলেন ব্র্যানসন। ব্যবসা চালু করার কিছু দিনের মধ্যেই তিনি ২৩ মিলিয়ন ডলার আয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ব্র্যানসন যখন এয়ারলাইন্স ব্যবসায় জড়ালেন তখন অনেক বিশেষজ্ঞই বলেছিলেন- তিনি নিশ্চিতভাবেই এই ব্যবসায় ধরা খাবেন। কিন্তু সবার ভাবিষ্যদ্বাণীকেই তিনি ভুল প্রমাণ করলেন। শুধু তাই নয়, ২০১৬ সালে বিক্রি হয়ে আলাস্কা এয়ারলাইন্সের সঙ্গে একীভূত হওয়ার আগে ভার্জিন এয়ারলাইন্সই ছিল ব্র্যানসনের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস। এই কোম্পানিটি ৪ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছিল আলাস্কা এয়ারলাইন্স।

এক সাক্ষাৎকারে ব্র্যানসন স্বীকার করেছিলেন, তার সবচেয়ে বড় ভুলটি ছিল ভার্জিন কোলা। এই কোমল পানীয়টি এক সময় বাংলাদেশেও বেশ জনপ্রিয় ছিল। শুধু তাই নয়, বিশ্বজুড়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোকা-কোলা এবং পেপসির চেয়েও এটি ভালো করছিল। কিন্তু এই ব্যবসায় তিনি সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছিলেন যখন নিজের পণ্যের প্রচারণা করতে গিয়ে নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারে কয়েকটি ট্যাংক নিয়ে হাজির হন এবং এসব ট্যাংক-এর সাহায্যে তিনি বেশ কিছু কোকা-কোলা ও পেপসির ক্যান গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। ব্যাপারটা ছিল এমন যে, ভার্জিনের কাছে ধরাশায়ী হলো কোকা-কোলা ও পেপসি! কিন্তু এই অপমান সহ্য করেননি কোমল পানীয় সাম্রাজ্যের মোগলরা। জানা যায়, আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বড় বড় চেইন শপগুলো থেকে ভার্জিন কোলা তুলে নেওয়ার জন্য অর্থ প্রদান করেছিল কোকা-কোলা। এই ব্যাপারটি কোকা-কোলা বনাম ব্র্যানসনের যুদ্ধ নামে খ্যাত। এই যুদ্ধে পরাজিত ব্র্যানসনের ভার্জিন কোলার আর কোনো অস্তিত্বই নেই বলা চলে। তবে, এই যুদ্ধ থেকে দারুণ একটি শিক্ষা পেয়েছিলেন ব্র্যানসন। এই শিক্ষাটি হলো- ব্যবসায় সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীকে কখনো শত্রুতে পরিণত করা উচিত নয়।

তবে ভার্জিন কোলায় পরাজিত হলেও ব্র্যানসন তারা ব্র্যান্ডকে আরও বিভিন্ন মাত্রায় সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। বর্তমানে আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, এশিয়া, ইউরোপ এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ভার্জিন গ্রুপের প্রায় ৭১ হাজার কর্মী রয়েছে। এই গ্রুপ থেকে নতুন ব্যবসা হিসেবে চালু করা হয়েছে- ট্রেন সার্ভিস ‘ভার্জিন হাইপারলুপ ওয়ান’, ভার্জিন হোটেলস এবং ২০১৮ সালে এই গ্রুপ সমুদ্রে নামায় ভার্জিন ভয়েজেস নামে বিশাল এক প্রমোদতরী।

তবে, সবকিছু ছাপিয়ে ভার্জিন গ্রুপ এবার আলোচিত অন্য এক কারণে। এই গ্রুপের সর্বশেষ ব্যবসা উদ্যোগটি হলো- ভার্জিন গ্যালাকটিক। এর মাধ্যমে মহাশূন্যে পর্যটকদের নিয়ে যাবে ভার্জিন গ্রুপ। ভার্জিন গ্যালাকটিক বর্তমানে ইলন মাস্কের মহাশূন্যে পর্যটন প্রতিষ্ঠান ‘স্পেস এক্স’-এর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তবে, এক্ষেত্রে ব্র্যানসনের সফলতা হলো- এই ব্যবসাটির বাস্তব রূপ দিতে তিনি ইতিমধ্যেই আরব-আমিরাত থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, এই কোম্পানির যাত্রী হয়ে মহাশূন্যে ভ্রমণের জন্য অন্তত ৭০০ পর্যটক নাম লিখিয়েছেন। এসব পর্যটকের প্রত্যেকেই আড়াই লাখ ডলার করে ভ্রমণের অগ্রিম খরচ জমা দিয়েছেন।

অন্যকে সহযোগিতা এবং উদ্দীপনা

২০০০ সালে রিচার্ড ব্র্যানসন ব্রিটেনের নাইট উপাধিতে ভূষিত হন। বিশেষ অবদান রাখার জন্য ইংল্যান্ডে রাজপরিবার থেকে মহামূল্যবান এই উপাধি প্রদান করা হয়। যারা এই উপাধি পান তাদের নামের আগে অফিশিয়ালি ‘স্যার’ শব্দটি যোগ করা হয়। পৃথিবীর বুকে এই পুরস্কারটিকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কয়েক দশক ধরে অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর পর ব্র্যানসন সিদ্ধান্ত নেন, তার আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ তিনি বিভিন্ন কম্যুনিটির মধ্যে ভাগ করে দেবেন। এই চিন্তা থেকেই ২০০৪ সালে তিনি ‘ভার্জিন ইউনিট’ নামে একটি অলাভজনক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বর্তমানে বেশ কয়েকটি বৈশ্বিক প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন। এসবের মধ্যে প্রবীণদের জন্য প্রতিষ্ঠিত ‘দ্য এলডারস’-এ তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। পৃথিবী ও সমুদ্রকে সুরক্ষিত রাখার জন্য নিরন্তর কাজ করে চলা তার প্রতিষ্ঠিত সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে ওশান ইউনাইট, কার্বন ওয়ার রুম, দ্য বি টিম এবং শিল্পোদ্যোক্তা তৈরি করার জন্য রয়েছে দ্য ব্র্যানসন সেন্টার সংস্থাটি।

এছাড়াও তার অনুপ্রেরণায় পৃথিবীজুড়ে অসংখ্য উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণের পাশাপাশি বক্তব্য দিয়ে মানুষকে অনুপ্রাণিত করছেন তিনি। বিলিয়নিয়ার হওয়ার মূল সূত্র হিসেবে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘অন্যরা যেখানে দেখে চ্যালেঞ্জ, আমি সেখানে দেখি সুযোগ। একজন ইতিবাচক ব্যক্তি হলে, আপনি ইতিবাচক কিছু সৃষ্টি করবেন এটাই স্বাভাবিক।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *